ব

ধর্মান্তরিত শাসক কর্তৃক বিশ্বকবির পূর্বপুরুষগণের সমাজচ্যুতি – কৃত্তিবাস ওঝা

ধর্মান্তরিত শাসক কর্তৃক বিশ্ব কবির পূর্ব পুরুষের সমাজচ্যুত। খুলনা জেলার অন্তর্গত রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ গ্রামে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষগণের আদিবাস। মহারাজা আদিশুরের রাজত্বকালে জলবেষ্টিত বঙ্গদেশে সনাতন ধর্মের প্রাধান্য ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে,বৌদ্ধ প্রভাবাচ্ছন্ন হতে শুরু করে। বৌদ্ধ প্রভাব-মুক্ত করে, বঙ্গদেশে সনাতন ধর্মের প্রভাব-প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে, তখন কান্যকুঞ্জ থেকে পাঁচ জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত নিয়ে আসা হয়।

এই পঞ্চ ব্রাহ্মণের মধ্যে শাণ্ডিল্য গোত্রীয় ক্ষিতিশ ছিলেন অন্যতম। ক্ষিতিশের পুত্র ভট্টনারায়ন বঙ্গদেশে বসতি স্থাপন করেন। ভট্টনারায়নের পুত্র দীননাথ, সিদ্ধশ্রোত্রীয় রাজা ক্ষিকিশুরের অনুগ্রহে বর্ধমান জেলার ’কুশ’’ নামক গ্রামের অধিকার পেয়ে “কুশারী” পদবী ধারন করেন।

বিশ্ব কবির পূর্ব পুরুষের

 

 

খ্রিষ্টিয় চর্তুদশ শতকে কুশারী বংশের ভিন্ন ভিন্ন শাখা, বাংলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা,বাকুড়া এবং যশোর-খুলনায় কুশারী বংশীয়দের বাসভূমি গড়ে ওঠে। খুলনার ভৈরব-তীরবর্তী পিঠাভোগ গ্রামের উত্তর প্রান্তে, রাম গোপাল কুশারী বসতি স্থাপন করেন। এই রাম গোপাল কুশারী এবং তার পুত্র জগন্নাথ কুশারীর বংশধারায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম।

 

গোবিন্দলাল রায় নামক এক ব‍্যক্তি, সুন্দরী মুসলিম রমনীকে বিয়ে করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘পির আলী মহম্মদ তাহের’ নাম ধারন করেন। ধর্মান্তরিত এই মানুষটির কাজই ছিল ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্যদের ধর্মনাশ করা। এই তাহের আলী জৌনপুরের শাসক খান জাহান আলীকে, চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ দিকে পথ দেখিয়ে যশোরের ‘বার বাজার’-এ নিয়ে আসেন। খ্যাতনামা এই ইসলাম ধর্মের প্রচারক বাগেরহাটে স্থিত হওয়ার আগে, তার স্তাবক তাহের আলীকে কসবা ও পয়ো গ্রামের শাসনভার দিয়ে যান।

 

 

তাহের আলীর দরবারে দক্ষিণডিহির জমিদারের দুই পুত্র কামদেব ও জয়দেব অমাত্য ছিলেন। এই দুই জনই তাহেরের ধর্মান্তর অভিযানের টার্গেট হয়েছিলেন। তাহের আলী ধর্মান্তরের উদ্দেশ্যে দরবারে সভা ডেকে, জয়দেব ও কামদেব সহ অনেক হিন্দুকে নিমন্ত্রণ করলেন এবং পর্দার আড়ালে গোমাংস রন্ধনের বিশাল আয়োজন করলেন। দরবারে প্রবেশমাত্র আমন্ত্রিত হিন্দুরা মুখে কাপড় চাপা দিয়ে সবাই পালাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাদের নির্গমনের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে,ছওয়াব কামানোর সুযোগ হাতছাড়া করেননি তাহের আলী। পলায়নরত হিন্দুদের ধরে এনে বললেন,”ঘ্রাণেন অর্দ্ধভোজনম্ – তোমরা গরুর গোস্ত খেয়ে ফেলেছ,তোমাদের জাত চলে গেছে, এবার ইসলাম কবুল করো।”

 

“দুই জনে ধরি পীর খাওয়াইল গোস্ত
পিরালী হইল তারা জাতি ভ্রষ্ঠ।”

এই ঘটনা কামদেব ও জয়দেবকে পিরালী মুসলমান করে দিল এবং তাদের অন্য দুই ভাই শুকদেব ও রতিদেবকে ধর্মান্তরিত করতে ব‍্যর্থ হয়ে,মুসলিম শাসক তাদের ‘পিরালী ব্রাহ্মণ’ – পরিচিতি দিয়ে সমাজচ্যুত করলো। অবিবাহিত রতিদেব আর বিয়ে করতে পারলেন না। তাহের আলীর ভয়ে কেউ তার কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে সাহস পেল না।

 

বিশ্ব কবির পূর্ব পুরুষের সমাজচ্যুতবিবাহিত শুকদেব মুসলিম শাসকের রুদ্ররোষে এদেশের প্রথম ‘পিরালী ব্রাহ্মণ’ – ঘোষিত হয়ে একঘরে হয়ে রইলেন। তার বিবাহযোগ‍্যা কন্যাকে কোন ব্রাহ্মণ পাত্র বিবাহ করতে চাইলো না – মুসলিম শাসক কর্তৃক সমাজচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায়। সেই সময় এক রাতে পিঠাভোগ থেকে কলকাতা যাওয়ার প্রাক্কালে ভৈরব নদ-এ প্রচণ্ড ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে, আশ্রয় সন্ধানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ জগন্নাথ কুশারী – অগত্যা পিরালী ব্রাহ্মণ শুকদেবের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলেন এবং অজ্ঞাত কোন কারণে তার কন্যাকে বিবাহ করলেন। সমাজচ্যুত শুকদেবের কন্যাকে বিয়ে করার দায়ে পিঠাভোগ গ্রামের কুশারী পরিবারটিকে, মুসলিম শাসক পিরালী-দায়গ্রস্থ করে সমাজচ্যুত করে ধর্মান্তরের জন্য প্রবল চাপ দিলো। কিন্তু শত অত্যাচার ও অসহনীয় অভাব-অনটন সত্ত্বেও কুশারীরা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হলেন না।

 

 

জগন্নাথ কুশারীর পরবর্তী পঞ্চম পুরুষ মহেশ্বর কুশারীর পুত্র পঞ্চানন ও প্রিয়নাথ। পঞ্চানন কুশারী ভাইয়ের আচরণে কষ্ট পেয়ে, যাবতীয় পৈত্রিক সম্পত্তি ভ্রাতার অনুকূলে হস্তান্তর করে, ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী কলকাতার গোবিন্দপুর গ্রামে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। সেই সময় গোবিন্দপুরে বসবাস করত জেলে, মালো, কৈবর্ত, পোদ, বণিক প্রভৃতি জাতি। এই তথাকথিত জলশূদ্রদের মধ্যে পঞ্চানন কুশারীরাই কেবলমাত্র একঘর ব্রাক্ষণ ছিলেন। ফলে ওই অঞ্চলের লোকজন পঞ্চানন কুশারীকে ভক্তিভরে ’ঠাকুর মহাশয়’- বলে ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। কেবল তাই নয়, এসময়ে ভাগীরথী নদীতে ব্রিটিশদের বানিজ্যতরী ভিড়ত।

 

সেই বানিজ্যতরীর মালামাল উঠানো-নামানোর ঠিকাদারী এবং খাদ্য সামগ্রী সরবরাহের ব্যবসা শুরু করেন পঞ্চানন কুশারী। এ কাজে স্থানীয় লোকদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করা হতো। এই শ্রমিকেরা তাকে ‘ঠাকুর’ – বলে ডাকায়,জাহাজে কর্মরত কর্মচারী ও কাপ্তানদের কাছেও তিনি ‘ঠাকুর’ – নামে পরিচিত হন। এই ভাবে একদিন পঞ্চানন কুশারীর নাম ও উপাধী ’ঠাকুর’’ ডাকের অন্তরালে অস্তমিত হয়ে গিয়ে, কাগজে- কলমেও ’ঠাকুর’ – উপাধী জারি হয়ে যায়।

 

পঞ্চানন ঠাকুরের পুত্র জয়রাম ঠাকুর আমিনের চাকরি করে, প্রভূত অর্থ উপার্জন করেন। জয়রাম ঠাকুরের পুত্র নীলমণি ঠাকুর, ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা শহরের মেছুয়া বাজার এলাকায় বৈষ্ণবচরণ শেঠের জমি ক্রয় করে বসতি স্থাপন করেন। নীলমণি ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বাড়ি কালক্রমে ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি’ – নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। নীলমণি ঠাকুরের তিন পুত্রের মধ্যে রামলোচন ঠাকুর ছিলেন নিঃসন্তান – তিনি ভ্রাতা রামমণি ঠাকুরের পুত্র দ্বারকানাথ ঠাকুরকে দত্তক-পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।

 

খুলনার দক্ষিণডিহি বিশ্বকবির ...

রামলোচন ঠাকুরের মৃত্যুর পর দ্বারকানাথ বৈষয়িক জীবনে যথেষ্ট উন্নতি করেছিলেন। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তিত হওয়ায় দ্বারকানাথ ঠাকুর অনেকগুলো জমিদারির মালিক হন। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিলাত যান এবং হিন্দুসমাজের প্রচলিত কুসংস্কার ও বিধিনিষেধ সমূহ সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে, ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজা রামমোহন রায়ের ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ -এর প্রতি আকৃষ্ট হন।

খুলনার দক্ষিণডিহি বিশ্বকবির পুর্ব পুরুষের বাড়ি।

 

দ্বারকানাথ ঠাকুরের তিন পুত্রের মধ্যে,দুই পুত্র অকালে মৃত্যুবরণ করে। জ্যেষ্ঠ পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বারো বছর বয়সে, ১২২৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে খুলনা জেলার(তৎকালীন যশোর) ফুলতলা থানার দক্ষিণডিহি গ্রামের পিরালী ব্রাহ্মণ রামনারায়ণ রায় চৌধুরীর ছয় বছরের কন্যা সারদা দেবীর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। সারদা দেবীর গর্ভে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পনেরোটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণ করা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দম্পতির চতুর্দশ সন্তান।

 

আমাদের সাথে থাকতে একটি লাইক দিয়ে রাখুন।-ধন্যবাদ

 

লেখক-কৃত্তিবাস ওঝা,ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক।
লেখকের আরো লেখা……