বহির বিশ্ব হিন্দু ধর্মের জয় যাত্রা

বহির বিশ্ব হিন্দু ধর্মের জয় যাত্রা, যার ইতিহাস হয়নি কখনো জানা-সোজাসাপ্টা

বহির বিশ্ব হিন্দু ধর্মের জয় যাত্রা, যার ইতিহাস হয়নি কখনো জানা। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নিজেদের পুরানো ধর্মীয় মতবাদের অন্তঃসারশূন্যতা এবং রাজনৈতিক দর্শনের ব্যর্থতা অনুভব করতে পেরেছে। ভোগক্লান্ত দেশগুলিও আত্মিক দিক থেকে অতৃপ্ত উপবাসী। তাদের অন্বিষ্ট মনে আগ্রহ এবং আন্তরিকতার সঙ্গে গৃহীত হচ্ছে সনাতন হিন্দুধর্ম। স্পেনের রাণী, রাজা কার্লোসের স্ত্রী, গ্রীসের রাজা কনস্টানটাইনের বোন রাণী সোফিয়া দীক্ষা নিলেন কাঞ্চি কামকোটির শঙ্করাচার্যের কাছে।

হিন্দু পদ্ধতিতে তিনি এখন নিত্য জপ করছেন। রাণী সোফিয়ার ব্যক্তিগত আগ্রহে ইউরোপের সাধারণ বাজারে গো হত্যা প্রায় নিষিদ্ধ। নেদারল্যান্ডের রাজমাতা জুলিয়ানা দীক্ষা নিলেন হিন্দুধর্মে। বৃটেনের যুবরাজ চার্লস এখন হিন্দুধর্মের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল। ইউরোপের বহু রাজপরিবার এবং ব্যারণ স্যাক্সনদের মত সম্ভ্রান্ত মানুষ ব্যক্তি জীবনের শান্তিও গভীরতার জন্য ভারতীয় সাধুসন্ন্যাসীদের কাছে নতজানু হচ্ছেন। লন্ডনের প্রায় তিন লক্ষ স্কুল ছাত্রছাত্রীদের আবশ্যিক পাঠ্যসূচী রামায়ণ। হিন্দু জীবনধারা, তাদের মূল্যবোধ, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে আত্মস্থ করার জন্য লন্ডনের বিদ্যালয়গুলিতে রামায়ণকে ধর্মশিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

সে দেশের ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে স্কুলে রামায়ণ কাহিনীর ওপর নাটক করে। শুচিতা, পবিত্রতায় মন্ডিত আদর্শ গৃহবধূ সীতা, তেজস্বী বীর আদর্শনিষ্ঠ রাম, সাহসী ভাই লক্ষণ, ভক্ত সেবক বীর হনুমান প্রভৃতি চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন বিভিন্ন বয়সের নারীপুরুষ। হাজারে হাজারে ইংরাজীতে অনূদিত হয়ে বিক্রী হচ্ছে রামায়ণ। শাড়ী পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বৃটেনের মেয়েদের। রামায়ণ সিরিয়াল হওয়ার পর রাস্তাঘাটে মেয়েরা সীতার অনুকরণে শাড়ী পড়ে কপালে

বিন্দিয়া লাগিয়ে বেড়াতে বেরোয়। লন্ডনে ‘ইলিয়া’ নামক একটি শিক্ষা সংস্থা স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা চালু করেছে ১৯৮৪ সাল থেকে। তারমধ্যে রামায়ণ অন্তর্ভুক্ত হয়। রাম-সীতা-লক্ষণকে ঘিরে যে আদর্শ পরিবারের মাধুৰ্য্যময় রূপ তা ছাত্রছাত্রীদের কাছে নিত্য বর্ণিত হচ্ছে। ইলিয়া জানিয়েছে যে রামায়ণের আদর্শে ভবিষ্যতের নাগরিকদের উজ্জীবিত করতে তাদের এই  শিক্ষাদান। ইউরোপে যুক্তিবাদী মানুষের কাছে হিন্দুধর্মকে পৌছে দেবার ব্যাপারে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ এবং ওয়েভ মেকানিকসের আবিষ্কর্তা আরউইন স্কুডিঞ্জার সাহেবের ভূমিকা অনবদ্য।

 

খৃষ্টধর্মের লোক হয়েও | তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন বেদান্ত দর্শন সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত। ১৯৮৫ সালে আমেরিকায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট রেগন সেখানে বার্তা পাঠিয়েছিলেন এই বলেঃ বৈচিত্র্যই হচ্ছে মার্কিন জীবনের ধারা। আমাদের জাতির শক্তির ভিত্তিও সেটাই। হিন্দুধর্ম প্রচারে আপনাদের এই প্রয়াস সেই বৈচিত্র্যকেই পুষ্ট করছে আমাদের | জাতির অব্যাহত অগ্রগতিতে আপনাদের জনগণ ও তাদের বংশধরদের | অতুলনীয় অবদানের জন্য আপনারা গর্ধরোধ করতে পারেন। হিন্দুদের সম্পর্কে এই হচ্ছে মার্কিনী জনগণের মনোভাব।

 

মধ্যপ্রাচ্যে কোনকালে শান্তি ছিল না, আজও নেই। এর কারণ অনুসন্ধান করতে এগিয়ে এলেন লেবাননের প্রথম প্রেসিডেন্ট কেমাল জামব্লাট। ক্রমাগত জলের উৎস অনুসন্ধানকারী যেমন একদিন সাগরে গিয়ে পৌঁছবে, তেমনি ধর্মীয় সত্যের অন্বেষণকারীদের পৌঁছতেই হয় হিন্দুধর্মে। কেমাল জামব্লাট ভারতে এলেন, বেলুড় ঘুরে গেলেন। নতুন প্রেরণা নিয়ে গেলেন, লেবাননে শান্তি ফেরানোর জন্য। তার ঘরে থাকতো ঠাকুর রামকৃষ্ণের ছবি। অশান্ত ধর্মের লোকেরা তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করল। লেবানন আজও অগ্নিময়—মৃত্যু, হত্যা নিত্যদিনের সঙ্গী।

১৯৮৭ সালে রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চের আয়োজনে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৮১ টি দেশের প্রতিনিধি এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। ভারতের প্রতিনিধি ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী হিরন্ময়ানন্দ মহারাজ। এই সম্মেলনে রুশ নেতারা স্বীকার করেন বিশ্ব জুড়ে ভয়াবহ পরমাণু যুদ্ধের পটভূমিতে রামকৃষ্ণ- বিবেকানন্দের বাণী বিশ্বকে শান্তির পথে নিয়ে যাচ্ছে। তারা আবেদন জানান রাশিয়ায় হিন্দুধর্ম প্রচারের জন্য পাঁচ হাজার সন্ন্যাসী চাই।

 

মিশনের বহু সন্ন্যাসী রাশিয়া যাবার আগে রুশ ভাষা শিখে নিচ্ছেন। রুশ সরকার পাঁচ একর জমি দিয়েছেন। সেখানে বেদান্ত অডিটোরিয়াম খােলা হচ্ছে। রামকৃষ্ণ মিশনের কিছু মানুষ সব ধর্ম সমান বলে একধরণের গােলমাল পাকিয়ে তােলেন। পৃথিবীর মানুষ বুজরুকি চায় না, ভেজাল চায় না—সত্য চায়। তাই ১৯৮৮ সালে রাশিয়ার শিক্ষামন্ত্রী কলকাতা এসে সােজা চলে গেলেন ভারত সেবাশ্রম সংঘের কাৰ্য্যালয়ে। দীর্ঘ আলােচনা করে বহু গ্রন্থ নিয়ে গেলেন, সন্ন্যাসীর আবেদন জানিয়ে গেলেন। ১৯৮৯ সালে রাশিয়ায় গেলেন এক সন্ন্যাসী, নাম পরমানন্দ ভারতী।

তার একটি অনুষ্ঠান হলাে ক্রেমলিন প্রাসাদে। লেনিন মূর্তির নীচে। প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রীসভার প্রত্যেকটি সদস্য এবং আরও দুহাজার রুশ ডিগনিটারিজ সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞানী, ধর্মযাজক, গণিতজ্ঞ, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, কবি, সমরবিশেষজ্ঞ। তাদের সকলকে ওঁ মন্ত্র উচ্চারণ এবং বৈদিক স্তোত্র পাঠ করিয়ে পরমানন্দ ভারতী অনুষ্ঠান শুরু করলেন। বাহুবলে, অর্থবলে প্রচারিত ধর্মের নামে অধর্মগুলি আজ স্রিয়মান। দেশে দেশে জয়যাত্রা শধু হিন্দুধর্মের। এটা একটা আকস্মিক হুজুগ নয়, অনেকদিনের অনেক ত্যাগ ও সাধনার পরিণতি। হিন্দুধর্ম তার ত্যাগ তিতিক্ষা পবিত্রতা তপঃশক্তির জোরে একদিন সারা পৃথিবীকে প্রভাবিত করেছিল।

 

এর প্রবক্তারা ভেবেছিলেন আমাদের বিচার অর্থাৎ দর্শন চরম সত্যে প্রতিষ্ঠিত, আর আমরা আচারনিষ্ঠ।আমাদের দেখে বাকী মানুষ শিখে নেবে, তাই আমাদের ধর্মের প্রচার নিষ্প্রয়ােজন। এজন্যই প্রচারে হিন্দুধর্ম কোনদিন বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। তখন পৃথিবীতে আক্রমণাত্মক প্রচারধর্মী কোন মতবাদও মাথাচাড়া দেয়নি, ফলে অসুবিধা ছিল না। পরবর্তীকালে যেগুলাে ধর্ম নয়—নিম্নমানের ব্যক্তিদের মাথা থেকে বের হওয়া মতবাদগুলাে নিজেদের ধর্ম বলে জগৎজুড়ে দাপাদাপি শুরু করে দিল। | কপটদের প্রচন্ড দাপটে সত্যধর্ম কোণঠাসা হয়ে গেল।

একালে প্রথম বিদেশে যিনি প্রচারের জানালা খুলে দিলেন, তিনি বিবেকানন্দ। মৃতপ্রায় হিন্দুধর্মে তিনি প্রাণসঞ্চার করলেন। বিদেশে পরবর্তীকালে অসংখ্য মানুষ হিন্দুধর্মের বৃক্ষে জলসিঞ্চন করেছেন। তারমধ্যে উল্লেখ করার মত ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়, ডঃ মহানামব্রত ব্রহ্মচারী, মহেশ যােগী প্রভৃতি। আর এখন অপ্রকট হয়েও যিনি সর্বাধিক প্রকট সেই ইস্কন প্রতিষ্ঠাতা এ. সি. ভক্তিবেদান্ততীর্থ মহারাজ।তারুকথা কিছু জানার প্রয়ােজন আছে।কলকাতার এক ব্যবসায়ীর সন্তান অভয়চরণ দে। বাবা গৌরমােহন দের ইচ্ছা ছিল অভয় বড় হয়ে একজন ভালাে কীর্তনীয়া হােক।

 

তাই তিনি ছেলেকে নিষ্ঠা সহকারে মৃদঙ্গ বাজানাে শেখাতেন। স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ার সময় অভয়ের সহপাঠী। ছিলেন সুভাষচন্দ্র। ১৯৩৩ সালে এলাহাবাদে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতীর কাছে দীক্ষা নিয়ে অভয়চরণ ভাগবত ও গীতার টাকা ভাষ্য রচনায় মনােযােগ দিলেন। ধর্মে গভীরতা এবং জীবনীশক্তি থাকলে একটি মানুষ কি অবাক করা কর্মকান্ড ছড়িয়ে দিতে পারেন সারা বিশ্বে তার জ্বলন্ত উদাহরণ-অভয়চরণ। ১৯৪৪ সালে তিনি নিজের চেষ্টায় ‘ব্যাক টু গড হেড়” নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তখন পর্যন্ত তিনি এলাহাবাদে।

 

ওখানে তার একটি ওষুধের দোকান ছিল। দে এন্ড সন্স। ব্যাক টু গড হেড়’ পত্রিকার পান্ডুলিপি টাইপ রা, প্রুফ দেখা, সম্পাদনা এবং বিতরণ, সব তিনি একা করতেন। পত্রিকা পাঠাতেন ভারতের তাবৎ বিদ্বজ্জনের কাছে এবং বিদেশের পন্ডিতদের কাছেও। তার পান্ডিত্য বহু বিদ্বানকে মুগ্ধ করে।

১৯৪৭ সালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ তাকে “ভক্তিবেদান্ত” উপাধি প্রদান করেন। ১৯৫২ সালে তিনি এলাহাবাদ থেকে ঝাসীতে বেদান্ত সংস্কৃত কলেজে বৈষ্ণব ধর্মের উপর বক্তৃতা করতে গেলেন। তার বক্তব্যে আকৃষ্ট হয়ে কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ প্রভাকর মিশ্র তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ডঃ মিশ্রের আগ্রহে তিনি ঝাসীতে একটি ভক্ত সংঘ গড়ে তােলেন। এই সংঘই পরিবর্তীকালে ইস্কন হয়। ১৯৫৪ সালে তিনি সংসার ত্যাগ করে বাণপ্রস্থ গ্রহণ করেন। বৃন্দাবনে তার স্থিতি হয়। এই সময় তিনি গভীরভাবে হিন্দু ধর্মশাস্ত্রসমূহ অধ্যয়ন করেন।

 

১৯৫৯ সালে তিনি সন্ন্যাস প্রাপ্ত হন এবং বৃন্দাবনে “রাধা দামােদর” মন্দিরে বাস করতে থাকেন। তখন তার বয়স ৬৩ বছর। ১৯৬৫ সালে ৬৯ বছরের এই বৈষ্ণবধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন আমেরিকা। সিন্ধিয়া ষ্টীম নেভিগেশনের সেক্রেটারী সুমতি মােরারজীর আনুকূল্যে জলদূত নামে মালবাহী জাহাজে পেলেন একটি বিনামূল্যের টিকিট। আর সঙ্গে ছিল মাত্র আট ডলার, যার তখন ভারতীয় মূল্য চল্লিশটা। মথুরার একব্যক্তির ছেলে থাকত নিউইয়র্কে। সে তার পিতার অনুরােধে একটি স্পনসর পাঠিয়েছিল। ফলে অভয়চরণ আমেরিকা পৌছে নিউইয়র্কে এই যুবকের বাড়ীতেই থাকতেন। 

 

লেখক এর পরবর্তী লেখা পড়তে একটি লাইক দিয়ে রাখুন।- ধন্যবাদ।

 


লেখক© অনিন্দ্য নন্দী

বহির বিশ্ব হিন্দু ধর্মের জয় যাত্রা, বহির বিশ্ব হিন্দু ধর্মের জয় যাত্রা, বহির বিশ্ব হিন্দু ধর্মের জয় যাত্রা, বহির বিশ্ব হিন্দু ধর্মের জয় যাত্রা, বহির বিশ্ব হিন্দু ধর্মের জয় যাত্রা,