চীনের ব্রহ্মপুত্র বাঁধ: ভারত ও বাংলাদেশের জন্য এক নতুন বিপদের বার্তা?
ব্রহ্মপুত্র নদ—কেবল একটি নদী নয়, এটি উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনরেখা। তিব্বতের কৈলাস পর্বতমালায় জন্ম নেওয়া এই নদী চীনে ইয়ারলুং জ্যাংবো নামে পরিচিত। এই নদীর বুকেই চীন নির্মাণ করছে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠছে, এই বিশাল বাঁধ কি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো ভয়ংকর ভূ-রাজনৈতিক কৌশল? চীন যদি এই নদীর জল আটকে দেয়, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে কে? ভারত, নাকি বাংলাদেশ?
চীনের দৈত্যাকার বাঁধ: পরিসংখ্যান ও উদ্দেশ্য
চীন যে বাঁধটি নির্মাণ করছে, তার আনুমানিক ব্যয় প্রায় ১৬.৮ বিলিয়ন ডলার। এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি ৩০০ মিলিয়ন মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। বাহ্যিকভাবে এটিকে একটি উন্নয়ন প্রকল্প মনে হলেও, এর অবস্থান এবং নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে থাকায় ভারত ও বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশগুলোর জন্য এটি এক বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলকে একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ চীনের হাতে চলে আসছে। এই বাঁধ শুধু জল ধরে রাখবে না, জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভাটির দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতাও দেবে বেইজিংকে।
ভারত নয়, কেন বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
অনেকের ধারণা, চীনের এই পদক্ষেপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত। কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। ব্রহ্মপুত্র নদের মোট জলপ্রবাহের মাত্র ৩০% আসে চীন নিয়ন্ত্রিত তিব্বত থেকে। বাকি ৭০% জলই তৈরি হয় ভারতের অরুণাচল প্রদেশ এবং আসামের বৃষ্টিপাত ও উপনদীগুলো থেকে।
এর অর্থ হলো, চীন যদি তার অংশের জল পুরোপুরি আটকে দেয়, তবুও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নদীর প্রবাহে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে না। হয়তো সাময়িক জল সংকট দেখা দিতে পারে, কিন্তু তা ভয়াবহ আকার নেবে না।
তাহলে আসল টার্গেট কে? উত্তরটি হলো—বাংলাদেশ।
যদি চীন জল আটকে দেয় এবং ভারত তার অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য নিজের ভাগের ৭০% জল ব্যবহার করে বা অন্য প্রকল্পে সরিয়ে নেয়, তবে বাংলাদেশের দিকে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রের ধারা প্রায় শুকিয়ে যাবে। এর পরিণতি হবে মারাত্মক:
-
কৃষি বিপর্যয়: বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষি জমি সেচের অভাবে মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
-
খাদ্য সংকট: ফসল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় দেশে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেবে।
-
নাব্যতা হ্রাস: নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌ-চলাচল ব্যাহত হবে এবং মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে।
-
লবণাক্ততা বৃদ্ধি: মিঠা পানির প্রবাহ কমে গেলে সমুদ্রের লবণাক্ত জল দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে, যা জমি ও পরিবেশের জন্য স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনবে।
এভাবেই একটি নীরব বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ, যার শুরু হবে নদীর বুক শুকিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
বাঁধ যখন যুদ্ধের অস্ত্র: “ওয়াটার ওয়ারফেয়ার”-এর ভয়ংকর রূপ
এই বাঁধ কেবল জল নিয়ন্ত্রণের কৌশল নয়, এটি একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের অস্ত্রও বটে। একে বলা হয় “ওয়াটার ওয়ারফেয়ার” বা জলযুদ্ধ।
ভাবুন তো, যদি ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে, তখন চীন যদি হঠাৎ করে বাঁধের সব গেট খুলে দেয়? তাহলে নিমেষেই ভারতের অরুণাচল ও আসামে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হবে। গ্রাম, শহর, ফসল—সবকিছু জলের তলায় চলে যাবে। আবার শুষ্ক মৌসুমে জল আটকে দিয়ে ভারতকে চাপে ফেলার কৌশলও নিতে পারে চীন।
এর পাশাপাশি রয়েছে আরও একটি ভয়ংকর ঝুঁকি। পুরো হিমালয় অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। অতীতে এই অঞ্চলে ৭.৭ রিখটার স্কেলের মতো শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। যদি এমন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই বিশাল বাঁধের কাঠামোতে ফাটল ধরে, তবে তা ভারত ও বাংলাদেশের জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।
পরিবেশের উপর অপূরণীয় আঘাত
তিব্বত মালভূমি কেবল একটি পার্বত্য অঞ্চল নয়, এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল “Ecological Hub”। এখানকার বরফ, আবহাওয়া এবং জলবায়ুর নিজস্ব ছন্দ রয়েছে। এই বিশাল আকারের বাঁধ হিমালয়ের পরিবেশগত ভারসাম্যকে চিরদিনের জন্য নষ্ট করে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা একে একটি “Irreversible Environmental Damage” বা অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যার প্রভাব পড়বে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ুর ওপর।
শেষ কথা: জল যখন কূটনীতির অস্ত্র
ভারত এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অরুণাচল প্রদেশে পাল্টা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে এবং চীনের কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পড়েছে গভীর চিন্তায়। কারণ এই বাঁধের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে নেই, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হওয়ার আশঙ্কা তাদেরই।
জল এখন আর কেবল জীবন নয়, এটি হয়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র। চীন যা নির্মাণ করছে, তা হয়তো একটি নিঃশব্দ যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে গুলি-বারুদের শব্দ নেই, কিন্তু রয়েছে লক্ষ কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
প্রশ্ন হলো, এই অঞ্চলের দেশগুলো কি তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে প্রস্তুত? বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মতো দেশগুলো কি একসঙ্গে এই সংকটের মোকাবিলা করতে পারবে? উত্তর যা-ই হোক, ব্রহ্মপুত্রের জল এখন কেবল নদীতে নয়, আমাদের ভাগ্য, অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যতের সংকেত হয়ে বইছে।