কন্যাদান কি অপমান কর নয়? মেয়ে কি দানের বস্তু?

বিবাহ কেন? বিবাহ না করলেই কি হয় না? বিবাহ না করলে কার কি ক্ষতি হবে? জীবনের একটা পথ হবেবলে, কি বিবাহ? না বিবাহ হলেই একটা গতি হবে? বিবাহের দ্বারা কোন বন্ধনে আবদ্ধ করে নয়।বিবাহ নামক প্রথা দ্বারা কেন মানুষকে সামাজিক বন্ধনে  আবদ্ধ করতে হবে? বিবাহের মাধ্যমে একটা মেয়েকে কেন পুরুষকে দান করতে হবে? বিবাহের জন্য এত আচার প্রথা কি কোন দরকার আছে? কন্যাদান কি অপমান করা নয়?? মেয়ে কি দানের বস্তু? গায়ে-হলুদ যজ্ঞ অর্থহীন বর্তমান যুগে। এসবের কি প্রয়োজন আছে?

“অবঙ্গ পতিতং ক্লিবা দশ দোশ বিমর্জি তা,

তুভ্যং কন্যা পদস্বামী দেবাগ্নি দ্বিজ সান্নিধ্যৌ”

অর্থাত্ ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বর কে সাক্ষী রেখে আমি আমার কন্যা কে তোমার নিকট সমর্পণ করলাম।

এই ধরনের মন্ত্র দ্বারা কেন বিবাহ নামক প্রথা আজও সমাজে টিকে থাকবে?

উপরের এই প্রশ্ন গুলো আমাদের বর্তমান শিক্ষিত সমাজের ভাই ও বোনের মধ্যে প্রতিনিয়ত উকি মারছে। এখন তাদের একটাই কথা এ ধরনের প্রথা সমাজ থেকে এখনই বিলুপ্ত করা হক।বুক ভর্তি করে শ্বাস নিতে দিতে হবে তাদের। আর কতদিন চলবে এই ধরনেরসামাজিক নির্যাতন? বিবাহ নামক প্রথা থেকে এখনি বেরিয়ে আসা হক?  বিবাহ দ্বারা ভালবাসা হীন সামাজিক বন্ধনের কি দরকার? ইত্যাদি, ইত্যাদি বিষয় কিন্তু আমাদের কাছে নতুন কিছু নয়। তারা সমাজের নিয়ম পরিবর্তন করতে চাই।

আসুন উপরের প্রশ্ন গুলো উত্তর খোঁজ করি-  ধর্ম-ডাক্তারি-রাজনীতি এই তিনটি বিষয়ে সবাই পন্ডিত। প্রতিটি মানুষ এই তিনটি বিষয়ে তার মত প্রকাশ করে থাকে।মুশকিল হলো কি জানেন, কেউ বিষয়গুলো তেমন না জেনে কথা বলে থাকে। সবাই যেন এই বিষয়ে স্পেশালিস্ট।কেরলের বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা নম্বুদ্রিপদ নম্বুদ্রি-ব্রাহ্মণ দের শাস্ত্রীয়রীতি নীতি মেনে তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল। যে রীতিনীতির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শঙ্করাচার্য।আপনার যদি বিবাহ তে আপত্তি থাকে তবে রেজিস্ট্রি করুন না। উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিবাহের আচার-অনুষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে অঞ্চল ভেদে। বাংলায় এক ধরনের আবার গুজরাটে অন্য ধরনের। তবে আচার-অনুষ্ঠান যাহোক প্রথা কিন্তু তিনটি সর্বত্র, যজ্ঞ, কন্যাদান, সপ্তপদী।এ প্রথা গুলো বৈদিক, বাকি সকল আচার-অনুষ্ঠান আঞ্চলিক। সনাতন ধর্মে অঞ্চলভেদে বিভিন্ন রীতি দেখা গেলেও বিবাহ এই তিনটি প্রথারী সমন্বয় দেখা যায় সর্বত্র।সকল বিষয়ে বিশদে আলোচনা করা এক সময়ে কঠিন, তাই আজ আমি আপনাদের মাঝে উপরে তিনটি রীতিবা প্রথা নিয়ে আলোচনা করছি সংক্ষেপে।

যজ্ঞ:আগুনকে পবিত্র মনে করা হয় কারণ এটি সব ধাতুকে পুড়িয়ে শুদ্ধ করে ও আগুনের গতি সব সময় উপরদিকে। অর্থাৎ প্রথমেই মনে করিয়ে দেয়া হয় যে বিয়েটা এক পবিত্র বন্ধন। বর-বৌ মন্ত্রবলে “যদিদং হৃদয়ং মম………” (অর্থাৎ, আমার হৃদয় তোমার হোক …)। বিয়ের ভিত্তিযে হৃদয়ের মিলন, সেটা স্পষ্ট করা হয়। বর-কনে মন্ত্র পড়ে পড়ে যজ্ঞের আগুনে ঘি আহুতি দেয় বারবার। কেন? এই যে সম্পর্ক হতে চলেছে একে সঞ্জীবিত (nurture) করে যেতে হবে জীবনের পথে। নাহলে এটা যান্ত্রিক হয়ে পড়বে।

কন্যাদান:কন্যা দান? আমাদের শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা এই কথাটি শুনলেই যেন চোখ চড়ক গাছের রুপ নেয়। দানকাকে করা হয়? অভাবী মানুষকে। গরীবকে পয়সা দেয়া, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দেয়া, নিরক্ষরকে শিক্ষা দেয়া ইত্যাদি শুনেছি। কিন্তু কন্যাদান কেন? আসুন সেটাই জানি এবার। আসলেই পুরুষ অনেক কিছুই শিখেছে, কিন্তু ঘর বাঁধতে শেখেনি, কেন? সে তো বাঁশ-খড় বা ইঁট-সিমেন্ট দিয়ে বাড়ি তৈরি করতে পারে! এখানে মুনি বলেছেন “গৃহিণী গৃহং উচ্যতে” (স্ত্রীই প্রকৃতঘর)। মূলত পরিবারে উপার্জন স্বামী করে আর সংসারের দেখ ভাল করে থাকে স্ত্রী। যেহেতু বরের সব শক্তি কম বেশি থাকে, কিন্তু ঘর বাঁধার জন্য যে শক্তির প্রযোজন তা থাকে না।তা মেটাবার জন্য স্ত্রী হল তার আসল শক্তি। শিক্ষা যেমন নিরক্ষরকে শক্তি দেয় তেমনি স্ত্রী শক্তি দেবে স্বামীকে, এ-কথাই মেয়ের বাবা বলছেন কন্যাদানের মাধ্যমে। স্বামীর ডান হাত শক্ত, ঐ হাত দিয়ে সে শিকার করে, অর্থ উপার্জন করে, যুদ্ধ করে। কিন্তু তার বাঁ হাত দুর্বল।আর পুরুষের বাহাত শক্ত করার জন্য স্ত্রীর স্থান স্বামীর বাঁ দিকে। স্ত্রী ঐদিককে শক্তি দেবে বলে স্ত্রীর স্থান স্বামীর বাঁ দিকে। তাই কন্যাদান কোন খারাপ বিষয় নয় বা স্ত্রীকেছোট করার মতন বিষয় নয়। বরং কন্যাদানের মাধ্যমে পুরুষকে তার দুর্বলতা থেকে মুক্ত করার হয়। যেমন শিক্ষা দানের মাধ্যমে নিরক্ষরকে আলোকিত করা হয়, তেমনি কন্যাদানের মাধ্যমে পুরুষকে পরিপুণ করা হয়।

সপ্তপদী: দীঘ সময় বসে বসে মন্ত্র পড়ার পর এবার একসাথে সাত পা চলাই সপ্তপদী। অর্থাৎ এখন থেকেশুরু যৌথ জীবন, একসাথে পথ চলা। তবে আগুনকে ঘিরে কেন? কারণ জীবনে অনেক রকম পরিস্থিতি বহু বাঁধা আসবে, কিন্তু এর মোকাবিলা করতে হবে দুজনে মিলে। যেটা অনেকটা আগুনকে মুকবলা মতো। সাত বার কেন? বাইরে ৭ ভুবন (ভাল-মন্দ নানান পরিস্থিতি) আর ভেতরে ৭ চক্র (মনেরনানা অবস্থা)। বাইরে-ভেতরে যাই হোক, স্বামী-স্ত্রীকে তার সমাধান করতে হবে একসঙ্গে— এটাই বলা হচ্ছে আসল কথা । এই যাত্রায় সুখে-দুঃখে একসাথে পথ চলার অঙ্গীকার।

বৌ_ভাত: নববধু পতিগৃহে এসে রান্না করে খাওয়ায় স্বামীর আত্মিয়-স্বজনকে। এর তাৎপর্য — বধুকেবলা হচ্ছে যে শুধু নিজের সংসারের জন্য কাজ করা নয়, সমাজের অন্য সকলে কথা ভাবতে হবে।গীতায় বলা হয়েছে, যারা শুধু নিজের জন্য রান্না করে তারা চোর। সপ্তপদীতে যে যৌথ জীবনের শুরু সেটা পরিণত হলো সমাজ জীবনে। স্বামী-স্ত্রীকে বলা হলো, কেবল নিজের পরিবারে সীমাবদ্ধনা থেকে সমাজের কথা ভাবতে।

বিবাহের মূল অনুষ্ঠান দুটি ভাগে বিভাগত্ব দেখা যায় — বৈদিক ও লৌকিক। লৌকিক প্রথাগুলি মেয়েলি আচার। এই কারণে এগুলি ‘স্ত্রীআচার’ নামে পরিচিত। হিন্দু বিবাহের উপরের বৈদিক আচার গুলির ছাড়াও অপরিহার্য হল কুশণ্ডিকা, লাজহোম (লাজ বা খই দিয়ে যজ্ঞানুষ্ঠান), পাণিগ্রহণ (কন্যার পাণি অর্থাৎ হস্ত গ্রহণ),ধৃতিহোম (ধারণ করার অর্থাৎ কন্যাকে ধরে রাখার যজ্ঞ) ও চতুর্থী হোম। এছাড়া পালন করা হয় অরুন্ধতী নক্ষত্র দর্শন, ধ্রুব নক্ষত্র দর্শন, শিলারোহণ ইত্যাদি বৈদিক প্রথা।বৈদিক প্রথাগুলি বিধিবদ্ধ শাস্ত্রীয় প্রথা ও বিবাহের মূল অঙ্গ।

বাঙালি হিন্দু বিবাহের লৌকিক আচারগুলো বহু বিধ হয়ে থাকে। এই প্রথাগুলি বর্ণ, শাখা, উপশাখা এবং অঞ্চল ভেদে ভিন্ন প্রকারের হয়।এগুলিরসঙ্গে বৈদিক প্রথাগুলির কোন ধরনের যোগ সূত্র নাই।